অন্ধকারে আস্তে আস্তে চোরের মতো বেয়ে উঠলাম দোতলার সেই বারান্দাটিতে।

ধনী লোকদের বাড়িগুলোর ডিজাইন যতই সুন্দর হোক না কেন, চোরদের চুরি করবার জন্য বেশ আদর্শের। বারান্দা বা জানালাগুলো বেশিরভাগ কেমন খোলামেলা হয়ে থাকে। আর দোতলা বারান্দায় উঠা কি এমন কাজ। চোরেরা এমন সব বাড়িতে কেন হানা দেয় না ঠিক বুঝিনা। বিদেশী কুকুরগুলো যতই হুমহাম করুক না কেন,আমাদের দেশের বাতাসের সংস্পর্শে এসে সবই ন্যাতা মেরে যায়। আর একজন দু'জন সিকিউরিটি গার্ডকে ফাঁকি দেয়া কি এমন কাজ। যাই হোক, চোরদের ভাল চিন্তা না করি আমি। যে কাজে এসেছি সেটা করেই না হয় বিদেয় নেই। শত হলেও ভালবাসার প্রমাণ বলে কথা। এই প্রমাণের জন্যই কিনা আজ এই চৌর্যবৃত্তি। নাহ,চৌর্যবৃত্তি কথাটা মানাচ্ছে না।



এখন বলি আসল ঘটনা। আমি ফারায।

একজনকে পছন্দ করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনটি হতেই। ঘুরে বেড়াতাম তার খোঁজে নানান ডিপার্টমেন্টে। কারণ, প্রথম দিন দেখা হয় নবীন বরণে, তখন তো আর জানা যায় নি কোন বিভাগের ছাত্রী সে।

যখন তার খোঁজ পেলাম, জানলাম দুই দুই বছরের সিনিয়র আমার থেকে, অসম্ভব মেধাবী ছাত্রী। আর আমি?কোনো মতে টেনেটুনে এইচএসসি পাশ করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। কি করে চান্স পেলাম এমন একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে তা আজো আমার নিকট রহস্যময় হয়ে থাকলো। তার নামটি ছিল তাহযিব। আশেপাশের সবাই বলতো তাযিব, আর আমি বলতাম তাবিজ। প্রথম প্রথম তার অপেক্ষায় ক্যান্টিনে বসে থাকা হা করে। এরপর একটু একটু কথা। একটু একটু ফোনে আলাপ। বয়সে বড় হবার কারণে আপু সম্বোধন করে কথা বলতাম। কিন্তু মনে মনে শুধু বলতাম তাহযিব, তাহযিব আর তাহযিব।



এভাবেই সময় চলেছিল।

একদিন ধুম করে জানিয়ে দিলাম, তাকে ভালবাসি আমি, অনেক অনেক অনেক।

বয়স তখন অল্প আমার, কোনো কিছুর ঠিক ঠিকানা নেই। কিভাবে কি করতে হয়, কিভাবে কি বলতে হয় কোনো কিছুরই ঠিক নেই আমার। যেটা মনে আসলো, বলে দিলাম। একদিন তাহযিবের সরাসরি হুমকি। তার পেছনে ঘোরাঘুরি বাদ দিয়ে পড়াশুনাতে মন দিতে হবে। আমার উত্তর ছিল যে, তার ভালবাসা পেলে শুধু পড়াশুনাতে নয়, সবকিছুতেই মন দেবো, অতিব ভ্দ্র ছেলে হয়ে যাবো ইত্যাদি ইত্যদি। কে শোনে কার কথা,গটগট করে হেঁটে চলে গেলো সামনে থেকে। মাঝে মাঝে কথা হতো ফোনে, কিন্তু দুই কি তিন মিনিট। আর এসএমএস দিলে তো কোনো উত্তর কোনোদিনও পাইনি। আজ রাতে হুট করে বরে বসলাম কি করলে তার মন পাও্য়া যাবে? উত্তর ছিল, সাহস থাকলে যেন তার বাড়ির বারান্দার সামনে দাঁড়াই রাত ৩টা বাজে। সাথে সাথে বুক চিতিয়ে মেনে নিলাম তার এই কথা, প্রমাণ হয়ে যাবে আজ রাতে একটা কিছু। যার দরুন আমি এখন তাহযিবের বারান্দায়। বিশাল উঁচু দেয়াল টপকে, বাড়ির পেছনের ঝোঁপ পাড় হয়ে নিশ্চিত হয়েছিলাম যে কুকুর দু'টো ছাড়া নেই। আর সামনের দিকে রয়েছে সিকিউরিটি গার্ড। এমন হাস্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে তো মনে মনে হেসেছিলাম আবার সৃষ্টিকর্তার নিকট শোকরিয়াও আদায় করলাম অবস্থা আমার অনুকূলে দেখে। মানুষ তার ভালবাসার জন্য কি না করে, ভাবলাম মনে মনে। নিজেকেই নিজে পিঠ চাঁপড়ে দিতে মন চাইলো এই বাহাদুরী দেখে।



তাহযিবের ঘুম বেশ পাতলা।

একটু শব্দেই ঘুম ভাঙ্গে তার। মোবাইলের টুংটাং শব্দে লাফিয়ে উঠলো সে, এতরাতে তাকে কেউ ফোন দেয় না সহজে। মোবাইলটা কানে ধরতেই ফারাযের শিশুদের মতো উল্লাস,

- হে হে হে, বারান্দার দরজাটা খুলবেন কি?

শুনে সাথে সাথেই তাহযিব লাফিয়ে উঠলো। তার ভেতরটা কেমন যেন ধুক ধুক করছে। এই আধা-পাগল ছেলেটার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই, কখন কি করে বসে কে জানে?



কাঁচের দরজাটা একপাশে টানতেই চমকে উঠলো তাহযিব।

তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফারায!

তুমি? এখানে? চাপা এবং ভীত স্বরে তাড়াতাড়ি বললো সে।

আপনি না বললেন আপনার বারান্দার সামনে দাঁড়াতে?

উফফ, আস্তে বলো, কেউ শুনবে। ওহ খোদা আমি কি করবো একে নিয়ে। তুমি..তুমি যাও।

পারবোনা।

প্লিজ বলছি, কেউ দেখে ফেলবে।

না দেখলেও এখন দেখবে। কারণ আমি আপনার মেইন গেট দিয়েই পাড় হবো। তখন বুঝবেন ঠ্যালা।

ইয়া খোদা, আমি কি করি। তুমি নিচু হয়ে বসো।

বসলাম, বলে ফারায অন্ধকারেই বসে পড়ে তাহযিবের বারান্দায়।

কি যেন চিন্তা করে বলে তাহযিব,

তুমি ভেতরে আসো। বেশি না, ব্যস, হ্যাঁ অতটুকু হলেই চলবে। আল্লাহই জানেন কেউ দেখেছে কিনা।

ফারায আধো বারান্দার শেষ আর তাহযিবের রুমের শুরুর দিকে বসে থাকে।

এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ঘরে টেবিল ল্যাম্প নেই? একটু জ্বালুন না। কিছুটা তো আলো হয়ে থাক।

তুমি কি বুঝতে পারছো কেউ যদি জানে ঘটনাটা কি অবস্থা হবে তোমার? তাহযিব বেশ ক্ষেদের সাথে বলে।

আরে কেউ তো টের পায়নি। আপনি একটু শান্ত হোন।



তাহযিব আস্তে করে চলে অন্ধকারের কোথাও কোনো সুইচ চাপতেই হলদে ম্রিয়মান এক আলো জ্বলে উঠলো ঘরের এক কোণে।

বাহ, আপনার রুম তো অনেক বড় আর সুন্দর। আসলে বড়লোকদের ব্যাপার স্যাপারই আলাদা। বলে হাসে ফারায।

কোনো জবাব না দিয়ে তাহযিব চুপ করে বসে থাকে বিছানার এক কোণে। খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে।
by- D F S

আপনার নিজের লেখা গল্প পাঠাতে পারেন এই ইমেইল অ্যাড্রেসে- golpobd@mail.com

XtGem Forum catalog